লেগ স্পিনটা তখনো কেউ বুঝত না, এখনো বোঝে না

তাঁর পরিচয় এখন আশরাফুলের কোচ। সেটা আসলে একধরনের অন্যায়। কারণ দীর্ঘ ২০ বছর সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলা এবং লেগ স্পিন শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা ওয়াহিদুল গনির নিজের কীর্তিই যথেষ্ট তাঁকে আলোকিত করে রাখতে। নোমান মোহাম্মদ সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে দেখলেন—এই একটি নয়, অন্যায়ের শিকার তিনি হয়েছেন বারবার। তবু কোনো ক্ষোভ নেই। লোভ নেই। জীবনের দৌড়ে পাগলের মতো অংশ না নিয়ে আজও হেঁটে বেড়ান নতুন প্রতিভার সন্ধানে। এরপর হয়তো চড়ে বসেন যাত্রীবাহী সাধারণ কোনো বাসে। বাসায় ফিরে একাকী জীবনের সঙ্গী মোহাম্মদ রফির গান। আর তখন মনে হয়, আপাত সাধারণ এই জীবনটাও কী উপভোগ্য! কত অর্থপূর্ণ!

প্রশ্ন : কোচ হিসেবে আপনি এত বিখ্যাত যে আপনার ক্রিকেটার-জীবন সেভাবে আলোচনায় আসে না। অথচ সেই ক্যারিয়ারটাও ভীষণ সাফল্যের। এই যে নিজের এক কীর্তিতে আরেক কীর্তি আড়াল হয়ে যাওয়া—এতে কেমন লাগে?

খন্দকার ওয়াহিদুল গনি : আমাকে লোকে কোচ হিসেবে চেনে, জানে—অবশ্যই ভালো লাগে। তবে মনে রাখতে হবে, প্রথমে আমি খেলোয়াড় ছিলাম। আর সে সময় থেকেই ছিল একধরনের পরিচিতি। আমার মতো অনেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়ে টেবিলে কলম ঘষে। কই, তাদের তো পরিচিত গণ্ডির বাইরে কেউ চেনে না। আমি যেহেতু ক্রিকেটার হিসেবেই সবার কাছে পরিচিত ছিলাম, ক্যারিয়ারের শেষ দিকে তাই ভেবেছি, এই অঙ্গনেই থাকতে হবে। সে কারণে কোচিংয়ে চলে আসি। আর কোচ হিসেবে পরিচিতি কতটা আমার যোগ্যতায়, জানি না। এটি আসলে আমার ছাত্রদের কৃতিত্ব।

প্রশ্ন : আপনার সবচেয়ে বিখ্যাত ছাত্র মোহাম্মদ আশরাফুল। শাহরিয়ার নাফীসের মতো ক্রিকেটারেরও প্রথম ক্রিকেট-পাঠ আপনার কাছে।

ওয়াহিদুল গনি : হ্যাঁ, ওদের প্রতিভাই আমাকে কোচ বানিয়ে দিয়েছে। আশরাফুল যখন ক্রিকেটার হয়নি, তখনো কিন্তু আমি কোচিং করাই। কিন্তু কেউ চিনত না। যেই আশরাফুল শ্রীলঙ্কায় সেঞ্চুরি করল, ওই মুহূর্ত থেকে সবাই আমাকেও চেনা শুরু করে। আমি ‘কোচ’ হয়ে গেলাম। সত্যি বলতে কী, খেলোয়াড়রাই কোচ তৈরি করে। যত ভালো খেলোয়াড়, কোচও তত ভালো।

প্রশ্ন : কিন্তু কোচদের কাছ থেকেও তো খেলোয়াড়রা অনেক কিছু শেখেন…

ওয়াহিদুল গনি : অবশ্যই শেখে। কিন্তু যে ক্রিকেটারের প্রতিভা আছে, সে বড় হবেই। আশরাফুল যদি আমার কাছে কোচিং না করত, তবু ও ক্রিকেটার হতো। কিন্তু ও আমার কাছে না এলে কোচ হিসেবে আমার এত নামডাক হতো না। এ কারণে আশরাফুলের কোচ হিসেবে অনেকে যখন আমাকে অনেক অনেক কৃতিত্ব দেন, তখন লজ্জা লাগে।

প্রশ্ন : লজ্জা কেন?

ওয়াহিদুল গনি : ওই যে বললাম, আশরাফুল ক্রিকেটার হয়েছে নিজের যোগ্যতায়। আমি কিছুটা সাহায্য করেছি মাত্র। আশরাফুল কিংবা শাহরিয়ার নাফীস যে মিডিয়ায় বারবার আমার কথা বলে, এটি ওদের মহত্ত্ব। শুনতে আমার ভালোই লাগে। আবার মানুষ এটি বেশি বেশি বলায় একটু বিব্রতও হই।

প্রশ্ন : আশরাফুল, নাফীসরা যে ‘অংকুর ক্রিকেট একাডেমি’র ছাত্র, এর যাত্রা শুরু কিভাবে?

ওয়াহিদুল গনি : আমি কোচিংয়ে আসি খেলোয়াড় থাকা অবস্থাতেই। ১৯৯৫ সালে দিনাজপুরে বিসিবির অনূর্ধ্ব-১৬ একটি ক্যাম্প হলো। সেখানে মূল কোচ ওসমান ভাই; তাঁর সহকারী আমি। কিছু দিন পর বোর্ড সভাপতি সাবের ভাই নিজের পয়সায় আরেকটি ক্যাম্প করেন। সেখানেই আশরাফুল, নাফীসসহ ৮০০-৯০০ ছেলে আসে। কিন্তু মাস দুয়েক পর বন্ধ হয়ে যায় ক্যাম্পটি। আমি দেখলাম, ওখানে বেশ কিছু প্রতিভাবান ছেলে আছে। ওরা কোথায় প্র্যাকটিস করবে? আমি যেহেতু তখন কোচিংয়ে পুরোপুরি নেমে পড়ার চিন্তা করছি, বোর্ডের যুগ্ম সম্পাদক অপু ভাইয়ের কাছ থেকে আবাহনীর ইনডোরের অ্যালটমেন্ট নিই সপ্তাহে তিন দিনের জন্য। সেখান থেকেই শুরু। আশরাফুল-নাফীসরা অনুশীলন করার জন্য আসে এখানে।

প্রশ্ন : ‘অংকুর’ নামটি এলো কিভাবে?

ওয়াহিদুল গনি : শুরুতে কোনো নাম ছিল না। পরে ভাবি, একটা নাম তো দেওয়া উচিত। ভাবলাম, একটি ফুলের প্রাথমিক অবস্থা ‘অংকুর’। ক্রিকেট শিখতে যেসব ছেলে আসে, ওরা এখন সে অবস্থায় আছে। আর ভবিষ্যতে ওদেরও ফুলের মতো বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সেই থেকে এই নাম। আমার অংকুর একাডেমিতে তখনো বিনা পয়সায় ছেলেদের ক্রিকেট শেখাতাম। আজ ২২ বছর ধরে বিনা পয়সাতেই শেখাচ্ছি।

প্রশ্ন : এই বিনা পয়সায় শেখানোর কারণ কী? আপনার এক সাক্ষাৎকারে পড়েছিলাম যে, ছোটবেলায় আপনার নানার বলা কথা নাকি এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে?

ওয়াহিদুল গনি : নানা বলেছিলেন, ‘তোমার যা কিছু ভালো, তা অন্যদের ভেতর ছড়িয়ে দেবে। কোনো টাকা-পয়সা নেবে না।’ নানার সেই কথা মনে রেখেছি।

প্রশ্ন : আশরাফুলের প্রতিভা কি শুরুতেই বুঝতে পেরেছিলেন?

ওয়াহিদুল গনি : ও আলাদা, একেবারেই আলাদা। শাহরিয়ার নাফীসও ভালো ছিল। কিন্তু আশরাফুলেরটা একেবারে সহজাত। ওকে আমি বেশি শিখিয়ে খাঁচায় বন্দি করতে চাইনি। ওর মতো করেই ছেড়ে দিয়েছি। অল্প কিছু জিনিস দেখিয়েছি শুধু।

প্রশ্ন : আপনার সঙ্গে তাঁর হেঁটে হেঁটে আবাহনী ক্লাব থেকে ঢাকা স্টেডিয়াম যাওয়ার গল্প তো বহুল প্রচলিত।

ওয়াহিদুল গনি : ও ছাড়াও আশিক, আরিফ, আনোয়ার—এমন অনেকেই আমার সঙ্গে হাঁটত। সত্যি বলতে কী, আশরাফুলের তখন বাস ভাড়া দেওয়ার টাকা ছিল না। এই ছেলেই কিনা প্রথম টেস্টে সেঞ্চুরির অমন বিশ্বরেকর্ড করল! আমি ট্রানজিস্টারে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সেই টেস্টে ধারাবিবরণী শুনতে শুনতে আবাহনী মাঠে আসছিলাম। আশরাফুলের যখন ৯৬ রান, তখন হাঁটা থামিয়ে যাই দাঁড়িয়ে। চামিন্ডা ভাসকে চার মেরে ও সেঞ্চুরি করে। সত্যি, সেটি ছিল অনেক বড় ভালো লাগার জায়গা।

প্রশ্ন : পরবর্তী সময়ে এই আশরাফুল জাতীয় দলকে অনেক কিছু দিয়েছেন। কিন্তু যখন তিনি ম্যাচ পাতানো কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েন, তা আপনার জন্য নিশ্চয়ই ছিল ভীষণ কষ্টের?

ওয়াহিদুল গনি : সত্যি খুব দুঃখ লেগেছে। বিশ্বাস করুন, আশরাফুলের মতো ভালো ছেলে হয় না। ও যে কিভাবে এর সঙ্গে জড়িয়ে গেল, ভাবতেই পারি না। আমার বিশ্বাস, ও ফাঁদের মধ্যে পড়ে গেছে। আমার সঙ্গে সব বিষয় নিয়ে ও কথা বলে। কেন যে এটি নিয়ে কথা বলল না!

প্রশ্ন : এবার একটু আপনার জীবনের, ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে ফিরি। যতটুকুন জানি, আপনার শৈশব কেটেছে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে। ক্রিকেটের শুরুও নিশ্চয় সেখানে?

ওয়াহিদুল গনি : হ্যাঁ। আমার জন্ম ঢাকার আরমানিটোলায়। কিন্তু বেড়ে ওঠা পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরে। বাবা আবদুল গনি খন্দকার পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের লাইব্রেরিয়ান ছিলেন। আমার জন্মের কিছু দিন পরই ওনার সেখানে বদলি হয়ে যায়। মা ওয়াহিদা রাব্বি ও আমাকে নিয়ে চলে যান সেখানে। আমরা পাঁচ ভাই, আমি সবার বড়। পরের চারজনের জন্ম লাহোরে। আমার ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত সেখানেই ছিলাম। ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে পাকিস্তানের সঙ্গে বিনিময় চুক্তির আওতায় আমরা স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে ফিরে আসি।

প্রশ্ন : বিনিময় চুক্তির আওতায় বাংলাদেশে ফেরেন মানে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় পাকিস্তানে ছিলেন। সময়টা কত কঠিন ছিল?

ওয়াহিদুল গনি : না, কঠিন ছিল না। কারণ আমরা ওদের সঙ্গে একেবারে মিশে গিয়েছিলাম। আমার মামার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান। উনি দেশের স্বাধীনতার জন্য বিমান নিয়ে চলে এসেছেন। তখন আমরা কিছুটা শঙ্কায় থাকলেও তেমন কিছু তো হয়নি। আমার আপন চাচাতো ভাই পাকিস্তান এয়ার ফোর্সের উইং কমান্ডার ছিলেন। উনি বাংলাদেশে ফেরেননি, এখনো ওখানে আছেন। মিথ্যে বলে লাভ নেই, ১৯৭১ সালের ওই সময়টায় পাকিস্তানে থাকলেও আমাদের তেমন সমস্যা হয়নি। লাহোরের প্রতিবেশীদের সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। এখনো যোগাযোগ আছে। ১৯৭৩ সালে চুক্তির আওতায় দেশে ফেরার পর আব্বা বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের লাইব্রেরিয়ান হলেন। এদিক দিয়ে কোনো সমস্যা ছিল না। কিছুটা সমস্যা হয়েছে লেখাপড়ার। কারণ ওখানে আমরা এক সিলেবাসে পড়ছিলাম, এখানে ভিন্ন সিলেবাস। তবে দ্রুতই মানিয়ে নিয়েছি।

প্রশ্ন : ক্রিকেটের শুরু লাহোরে বলছিলেন। আগ্রহের জায়গাটা ক্রিকেটই কেন?

ওয়াহিদুল গনি : লাহোরে খেলা বলতে তো ক্রিকেটই। অলিতে-গলিতে ক্রিকেট হয়। সব বাচ্চারা খেলে। আমার আগ্রহের আরেক কারণ, ছোটবেলা থেকেই দেখতাম আব্বা কানে ট্রানজিস্টার লাগিয়ে কী যেন শোনেন। পরে বুঝি, তা ক্রিকেটের ধারাভাষ্য। ওনার সঙ্গে মাঠে গিয়ে অনেক খেলাও দেখেছি। কলিন কাউড্রের টেস্ট সেঞ্চুরি দেখেছি মাঠে বসে। তবে ক্রিকেটে আসার বড় কারণ, লাহোরের পাড়া-মহল্লা সব জায়গায় ক্রিকেটের চর্চা। শুনলে হয়তো অবাক হবেন, আমাদের সঙ্গে খেলত আবদুল কাদিরও।

প্রশ্ন : তাই নাকি!

ওয়াহিদুল গনি : হ্যাঁ। একই এলাকায় থাকত। খুব গরিব ঘরের ছেলে। কিন্তু ক্রিকেটটা ভালোবাসত খুব। ওর একটা সাইকেল ছিল। সেটি চালিয়ে চালিয়ে ঘুরত আশপাশের মাঠে মাঠে। যেখানে খেলোয়াড় কম, নেমে পড়ত সেখানেই। আমি আর কাদির একসঙ্গে অনেক ম্যাচ খেলেছি। এখন শুনতে হয়তো অবিশ্বাস্য শোনাবে, তবে ওই বয়সে আমরা দুজন মোটামুটি একই মানের লেগ স্পিনার ছিলাম। পরে ১৯৭২ থেকে হঠাৎ করে ওর বোলিং অনেক ভালো হয়ে যায়। পরবর্তীতে আবদুল কাদির খেলার জন্য দু-তিনবার বাংলাদেশে আসে। লাহোরের দিনগুলো নিয়ে তখন আমাদের অনেক আড্ডা হয়েছে।

প্রশ্ন : ক্রিকেটের সবচেয়ে কঠিন শিল্পগুলোর একটি ধরা হয় লেগ স্পিনকে। আপনি সেদিকে ঝুঁকলেন কিভাবে?

ওয়াহিদুল গনি : আমার শুরু মিডিয়াম পেস বোলিং দিয়ে। এর মধ্যে একটি স্লোয়ার করতাম, যেটি লেগ ব্রেকের মতো হয়। এলাকার ‘প্রিন্স ক্রিকেট ক্লাব’-এ দুটি দল ছিল। সিনিয়রদের একটি, জুনিয়রদের আরেকটি। আমি পরের দলে। একদিন সিনিয়রদের বিপক্ষে বোলিংয়ে ওই স্লোয়ার লেগ ব্রেক করি। অধিনায়ক নাসির ভাই বলটি খেলে আমার কাছে এগিয়ে এসে পাঞ্জাবি ভাষায় বলেন, ‘কাল সে লেগ স্পিন কারনা।’ এই আমি মিডিয়াম পেসার থেকে লেগ স্পিনার হয়ে যাই। আর কেন জানি, ইন্তেখাব আলম, মুশতাক মোহাম্মদের মতো লেগ স্পিনারের বোলিং দেখতে সব সময় আমার খুব ভালো লাগত। নাসির ভাইয়ের কথা শুনে যখন লেগ স্পিন শুরু করি, দেখি বল ঘুরছে, বাউন্স পাচ্ছি, সবাই বাহবা দিচ্ছে—নিজের ভালো লাগার জায়গা বেড়ে যায় আরো।

প্রশ্ন : বাংলাদেশে ফেরার পর এই ক্রিকেট চর্চা এগোয় কিভাবে?

ওয়াহিদুল গনি : এই জায়গায় আমরা একটু হতাশ হই। কারণ পাকিস্তানে সারা বছর ক্রিকেট হতো আর এখানে বছরে মোটে তিন মাস। আমরা ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশে আসি তো। ক্রিকেট মৌসুম শুরু হওয়ার সময়। আমার মামা মাহবুব মাওলা একসময় ওয়ান্ডারার্সে ফুটবল খেলতেন। উনি আমাকে ওই ক্লাবে নিয়ে যান। ওয়ান্ডারার্সে তিন মৌসুম খেলি আমি। এর পর থেকে তো মোহামেডানেই। আমার বাকি চার ভাইও কিন্তু ঢাকায় লিগ ক্রিকেট খেলেছে। বেশি দূর এগোতে পারেনি।

প্রশ্ন : ক্রিকেটারই হব—এমন কোনো ভাবনা তখন ছিল কি?

ওয়াহিদুল গনি : তা না। লেখাপড়া করতে হবে, লেখাপড়া করেছি। ১৯৭৪ সালে ম্যাট্রিক দিই মতিঝিল গভর্নমেন্ট স্কুল থেকে। এরপর আদমজী কলেজ থেকে ১৯৭৬ সালে ইন্টারমিডিয়েট। ভর্তি হই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইতিহাস বিভাগ থেকে মাস্টার্স পাস করে বেরোই ১৯৮১ সালে। কিন্তু পড়ালেখার পাশাপাশি ক্রিকেট খেলা যাই চালিয়ে। বাংলাদেশে যেহেতু তখন তেমন কোনো লেগ স্পিনার ছিল না, আমার খুব চাহিদা তৈরি হয়। আর এটি তো ভালোবাসার জায়গা। সে কারণে পড়ালেখা শেষে আরো অনেক দিকে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও থেকে যাই ক্রিকেটে।

প্রশ্ন : মোহামেডানে যোগ দেন কবে?

ওয়াহিদুল গনি : ১৯৭৬ সালে। ওখানে যাওয়ার পর এএসএম ফারুক ভাই আমাকে পুরোপুরি লেগ স্পিনার বানিয়ে দেন।

প্রশ্ন : হ্যাঁ, কোথায় যেন শুনেছিলাম, ঢাকা লিগে শুরুর দিকে আপনি টপ অর্ডারে ব্যাটিংও করতেন?

ওয়াহিদুল গনি : ঠিকই শুনেছেন। ওপেনার ছিলাম, তিন নম্বরে ব্যাটিং করেছি। ওয়ান্ডারার্সে শুরুর দিকে তো মূলত ব্যাটিং অলরাউন্ডার ছিলাম। মোহামেডানের বিপক্ষে লিগে এক ম্যাচে ফিফটি করি, পরেরবারই ওরা আমাকে দলে নিয়ে নেয়।

প্রশ্ন : পুরোপুরি লেগ স্পিনার হয়ে ওঠেন কিভাবে?

ওয়াহিদুল গনি : আসলে তান্না ভাই, রুমি ভাইদের বাইরে বাংলাদেশে তখন তেমন লেগ স্পিনার ছিল না। কিন্তু পাকিস্তানে অনেক লেগ স্পিনার। তাদের শেখানোর জন্য এলাকায় এলাকায় অনেক কোচ। আমি তাঁদের কাছ থেকেই লেগ স্পিনের বেসিকটা শিখে এসেছি। কিভাবে বল টার্ন করে, কিভাবে গুগলি হয়, ফ্লিপার দিতে হয় কিভাবে—সব। মোহামেডানে যাওয়ার পর অধিনায়ক ফারুক ভাইয়ের প্রেরণায় সেগুলোর চর্চা বেড়ে যায় অনেক। উনি আমাকে শুধু লেগ স্পিনার হিসেবেই তৈরি করতে চেয়েছেন। এই ফারুক ভাইয়ের মতো ভালো মানুষ হয় না। ওনার কারণেই ব্যাটিংয়ে মনোযোগ কমিয়ে পুরোপুরি লেগ স্পিনার হয়ে যাই। পরেও লোয়ার অর্ডারে আমার অনেক ভালো ভালো ইনিংস আছে।

প্রশ্ন : মোহামেডানের হয়ে আবাহনীর বিপক্ষে আপনার হ্যাটট্রিক রয়েছে। ওই স্মরণীয় মুহূর্তের স্মৃতিচারণা যদি করেন?

ওয়াহিদুল গনি : এটি সম্ভবত ১৯৭৮-৭৯ মৌসুমে, শহীদ স্মৃতি টুর্নামেন্টের ফাইনালে। আমরা সেবার লিগ জিতেছি, স্বাধীনতা দিবস টুর্নামেন্টও। শহীদ স্মৃতিতে মোহামেডানের সামনে হ্যাটট্রিক শিরোপা জেতার সুযোগ। কিন্তু সুযোগটা কাজে লাগাতে পারব বলে একসময় মনে হচ্ছিল না। আগে ব্যাটিং করে আমরা অলআউট খুব কম রানে, মনে হয় ৭৬ রানে। উইকেট কঠিন ছিল কিন্তু আবাহনী পাঁচ উইকেটে ৬৫ রান তুলে ফেলে। হাতে পাঁচ উইকেট নিয়ে ১০-১২ রানের মতো লাগে। ফারুক ভাই ওই সময়ই আমার হাতে বল তুলে দেন। বলেন, ‘উইকেটে স্পিনারদের জন্য সাহায্য আছে। তুমি ঠিক জায়গায় বল ফেলতে পারলে জিতে যেতে পারি।’ আমি ওই স্পেলে ১৭টি বল করি। তিন রান দিয়ে নিয়ে নিই পাঁচ উইকেট, যার মধ্যে রয়েছে হ্যাটট্রিকও। দলের জয়, নিজের হ্যাটট্রিক, শেষ পাঁচ উইকেট শিকার—আবাহনীর বিপক্ষে সেই ম্যাচ আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় অর্জনগুলোর একটি। ঢাকার মাঠের ৩০-৪০ হাজার দর্শক সেদিনই হয়তো প্রথম বুঝতে পারে, লেগ স্পিন কত বড় শিল্প।

প্রশ্ন : হ্যাটট্রিকের শিকার তিন ব্যাটসম্যানের নাম মনে আছে?

ওয়াহিদুল গনি : দীপু চৌধুরী, আজম ভাই ও সাদ। শেষ ক্যাচটি ধরেন উইকেটকিপার মনজুর ভাই, পরবর্তীতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সিইও হন যিনি। পরদিন পেপারে অনেক লেখালেখি হয়, ছবিও আসে। দৈনিক বাংলার কামরুজ্জামান ভাই অনেক সুন্দর একটি লেখা লেখেন। উনাকে অবশ্য আমি মামা বলে ডাকি, আমার মামার ছোটবেলার বন্ধু তিনি।

প্রশ্ন : ওই হ্যাটট্রিকের পরই কি দেশের ক্রিকেটের বড় তারকা হয়ে ওঠেন?

ওয়াহিদুল গনি : না, মোহামেডানে আগের দুই বছর খেলার সুবাদে আগে থেকেই তারকা। ১৯৭৬-৭৭ মৌসুমে প্রথমবারের মতো লিগ চ্যাম্পিয়ন হয় মোহামেডান। সেখানেও আমার অবদান রয়েছে। চার দিনের ফাইনালের শেষ দিকে আবাহনীর এক উইকেট হাতে নিয়ে প্রয়োজন সম্ভবত ২৩ রান। ওরা সেটি প্রায় করেই ফেলছিল। এরপর সাজু ভাইয়ের বলে একটি ক্যাচ ওঠে, মিড উইকেট থেকে অনেক দূর দৌড়ে গিয়ে অনেক কঠিন একটি ক্যাচ ধরি আমি। পুরো ম্যাচের সবাই সব কিছু ভুলে যায়, সবার মাতামাতি এই ক্যাচে। আমাকে মাথায় নিয়ে সমর্থকদের সে কী নাচ! এর বাইরেও উইকেট পেয়েছি নিয়মিত। আবাহনীর বিপক্ষে মোহামেডানকে জিতিয়েছি অনেক ম্যাচ। একবার ওদের শেষ ওভারে জয়ের জন্য ৬ রান দরকার ছিল। আমি তিন রান দিয়ে তিন উইকেট নিয়ে মোহামেডানকে জিতিয়ে দিই।

প্রশ্ন : সাজু ভাইয়ের কথা বলছিলেন। এখনকার স্বাস্থ্য দেখে বোঝার উপায় নেই, তবে শুনেছি যে খেলোয়াড়ি জীবনে আপনি বেশ মোটাসোটা ছিলেন। সাজু, দৌলতুজ্জান ও ওয়াহিদুল গনি—মোহামেডান নাকি ছিল ‘তিন মোটা’র দল?

ওয়াহিদুল গনি : (হাসি) হ্যাঁ, খেলোয়াড়ি জীবনে বেশ মোটা ছিলাম। জাতীয় দলের নির্বাচকরা আমাকে বাদই দিতেন সে কারণে। পরে অনেক হাঁটহাঁটি, দৌড়াদৌড়ি করে স্বাস্থ্য কমিয়েছি…

প্রশ্ন : কিন্তু নির্বাচকদের সুনজরে তো পড়েননি! ভাবতে বিস্ময়কর লাগে যে, কোনো আইসিসি ট্রফির দলে আপনি ছিলেন না!

ওয়াহিদুল গনি : আমার সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে। আবাহনীর সঙ্গে হ্যাট্রটিকসহ পাঁচ উইকেট নেওয়ার কথা একটু আগে বললাম না। এরপর দল যায় আইসিসি ট্রফি খেলতে। কিন্তু আমাকে মূল দল কী, ৫০ জনের প্রাথমিক স্কোয়াডেও ডাকেনি। শুধু সেবার না, কোনোবারই আমি আইসিসি ট্রফির প্রাথমিক দলে থাকতে পারিনি। কিন্তু রেকর্ড বই খুলে দেখুন। ঢাকা লিগ, জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে আমার উইকেটের অভাব নেই। ১৯৭৮ সালে শ্রীলঙ্কা আসে বাংলাদেশ সফরে। আমাদের চারটি জোনের স্কোয়াড করা হয়। সেবার ঢাকা লিগে আমার সর্বোচ্চ উইকেট, তবু কোনো জোনেই আমাকে রাখেনি। আমার মনে হয়, তখনকার নির্বাচকরা লেগ স্পিন ব্যাপারটা বুঝতেন না। নইলে আইসিসির কোনো ক্যাম্পেও আমি থাকব না? থাকলে যে ১৯৯৭ সালের মতো বাংলাদেশ আইসিসি ট্রফি চ্যাম্পিয়ন হয়ে যেত, তা হয়তো না। কিন্তু লেগ স্পিন দিয়ে সে সম্ভাবনার একটা জায়গা হয়তো আমি তৈরি করতে পারতাম।

প্রশ্ন : নির্বাচকরা লেগ স্পিন বুঝতেন না বললেন, অথচ চট্টগ্রামের এক ম্যাচে পাকিস্তানের বিখ্যাত ক্রিকেটার মাজিদ খান নাকি আপনার গুগলিতে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন?

ওয়াহিদুল গনি : মাজিদ খান না, মুদাসসর নজর। জাতীয় দলে সেটি আমার প্রথম ম্যাচ; ১৯৭৮-৭৯ মৌসুমে। বলটি ও প্রথাগত লেগ স্পিন ভেবে ছেড়ে দেয়, কিন্তু সেটি ছিল গুগলি। ওর সৌভাগ্য আর আমার দুর্ভাগ্য যে, বল স্টাম্পের ওপর দিয়ে চলে যায়। ও বোল্ড হয়নি। কিন্তু মুদাসসর পরে আমাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে কেউ এমন গুগলি দিতে পারে, ভাবতেই পারিনি।’ আমি বলি, ‘এসব লাহোর থেকে শিখেছি।’ ও-ও লাহোরের। খুশি হয়ে বলে, ‘তাই নাকি? সেখান থেকেই তাহলে শিখেছ!’ ম্যাচটি পরে পণ্ড হয়ে যায়। দুই দিনের ম্যাচ এক দিনের বেশি হতে পারেনি। পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা বাংলাদেশকে নিয়ে কী নাকি মন্তব্য করেছে। তার জেরেই দর্শকরা মাঠে ঢুকে পণ্ড করে দেয় খেলা।

প্রশ্ন : আপনি তো ওয়ানডেও খেলেছেন মাত্র একটি। ১৯৮৮ এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে চট্টগ্রামে। ওখানে ছয় ওভার বোলিং করে দেন ৩২ রান…

ওয়াহিদুল গনি : না, ২৯ রান। স্কোরকার্ডে ভুল লেখা আছে। পাকিস্তান সে ম্যাচে অনেক রান করে। ওদের দুই ব্যাটসম্যান করেন সেঞ্চুরি। সেদিন আমি ভালোই বোলিং করেছি। কিন্তু কেন যে আমাকে পুুরো ১০ ওভার বোলিং করানো হয়নি, জানি না। কেন পরের ম্যাচে একাদশে রাখা হয়নি, তাও জানি না। কিন্তু আমি মনে করি, ওই ম্যাচের বোলিং দিয়ে পরের খেলায় একাদশে থাকাটা উচিত ছিল। শ্রীলঙ্কা ম্যাচের পর ওদের কোচ আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি খেললে না কেন?’ কী বলব! আমার আসলে অনেক দুর্ভাগ্য। মোহামেডানে খেলতে এসেছিল অর্জুনা রানাতুঙ্গা, ও সবাইকে বলত, ‘জন্ম শ্রীলঙ্কায় হলে ওয়াহিদুল গনি টেস্ট খেলত।’ ভারতের ক্রিকেটার প্রণব রায়ও অনেক দিন খেলেছে মোহামেডানে। ও-ও আমাকে বলত, ‘ভারতে জন্মালে তুমি টেস্ট খেলতে।’

প্রশ্ন : নেটে নাকি আপনি ছিলেন যাকে বলে আনপ্লেয়েবল। কিন্তু ম্যাচে ঠিক তেমনটা না। এটি কি সত্যি?

ওয়াহিদুল গনি : সত্যি, আবার সত্যিও না। দেখুন, ম্যাচে ভালো না করলে মোহামেডানের মতো দলে কিভাবে টানা ২০ বছর খেলেছি? তবে এটি ঠিক, নেটে আমার বোলিংটা অনেক ভালো হতো। কারণ সেখানে অনুশীলন হতো সিমেন্টের পিচে। টার্ন বেশি পেতাম, বাউন্স অনেক বেশি। রানাতুঙ্গা, রুমেশ রত্নায়েকেরাও আমাকে ঠিকমতো খেলতে পারত না। আর ঢাকা স্টেডিয়ামে ছিল স্লো উইকেট। টার্ন পেলেও বাউন্স পাওয়া যেত না। সে কারণে বোলিংয়ে ধার একটু হয়তো কম থাকত।

প্রশ্ন : ঢাকার মাঠে আপনার বোলিংয়ের চেয়ে বেশি টার্ন কি আর কারো ছিল?

ওয়াহিদুল গনি : এটি অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করলেই ভালো। তবে মনে হয় না, আমার চেয়ে বেশি টার্ন আর কারো ছিল। এ জন্য অনেকে আমাকে ডাকত ‘ঢাকা টু চিটাগং’। মানে বল ঢাকায় পড়ে টার্ন করে চিটাগং চলে যায়।

প্রশ্ন : ‘ঢাকা টু চিটাগং’-এর চেয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটাঙ্গনে বহুল প্রচলিত একটি আদুরে নাম আছে আপনার—‘কাকা’। এই নামকরণের রহস্য কী?

ওয়াহিদুল গনি : মোহামেডানে সেলিম ভাই নামে এক ক্রিকেটার ছিলেন। তাঁকে আমরা সবাই ডাকতাম ‘কাকা’। উনি খেলা ছাড়ার পর ‘কাকা’ ডাকার আর কেউ রইল না। আমি তখন অনেক সিনিয়র। ক্রিকেট খেলেছি ৩৮ বছর বয়স পর্যন্ত। ওই সেলিম ভাইয়ের অবসরের পর আমাকে মোহামেডানের সবাই আমাকে ‘কাকা’ ডাকা শুরু করে। আস্তে আস্তে পুরো দেশের ক্রিকেটের কাকা হয়ে গেলাম।

প্রশ্ন : মোহামেডানে পারিশ্রমিক পেতেন কেমন?

ওয়াহিদুল গনি : তেমন একটা না। ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত দীর্ঘ ২০ বছর খেলেছি। এবং তা প্রায় বিনা পয়সায়। ২০-২৫ হাজার টাকা হয়তো দিত ভেঙে ভেঙে। ক্লাব তেমন কিছুই দিত না। বিসিবি থেকে ক্লাবের অনুদানের টাকা নিয়ে তা হয়তো মনি ভাই আমাকে দিয়ে দিতেন।

প্রশ্ন : তবু মোহামেডান ছাড়েননি কেন?

ওয়াহিদুল গনি : ভালোবাসার কারণে। ফারুক ভাই, দলিল ভাই, খালেদ ভাই, মনি ভাইদের মতো অসাধারণ লোক ছিলেন বলে। অন্যান্য দল প্রতিবছর প্রস্তাব দিলেও তাই ক্লাব বদলাইনি। কিন্তু মোহামেডান আমাকে মূল্যায়ন করেনি সেভাবে। এক বছর ক্রিকেট খেলে অনেকে এখন ক্লাবের বড় কর্তা, আমি সেখানে সাধারণ সদস্য পর্যন্ত হতে পারিনি। ওদের কোচিং করানোর জন্যও আমাকে ডাকে না।

প্রশ্ন : লেগ স্পিনারদের জন্য অধিনায়কের আস্থা তো বড় ব্যাপার। সেটি সব সময় পেয়েছেন?

ওয়াহিদুল গনি : মোহামেডানে পেয়েছি। আবদুল কাদির সব সময় একটি কথা বলেন, ‘আমার জন্য ওপরে আল্লাহ আর নিচে ইমরান খান। ইমরানের জন্যই আমার এত সাফল্য।’ মোহামেডানে আমার সাফল্যেও অধিনায়কদের অনেক ভূমিকা। আবার আমি সাফল্য পেতাম বলেই তারা আমার ওপর ভরসা করতেন।

প্রশ্ন : কিন্তু ঢাকার মাঠের একটি চালু গল্প পুরনো দিনের দর্শকদের কাছ থেকে শোনা যায়। আবাহনীর বিপক্ষে ম্যাচে মোহামেডান অধিনায়ক রকিবুল হাসান আপনার হাতে বল দিয়ে বলেন, ‘নাও, বোলিং করো। খাইবা তো চার আর ছয়’…

ওয়াহিদুল গনি : রকিবুল ভাই এমনই। সবার সঙ্গে ওভাবেই কথা বলে। তবে আমার ওপর তাঁর আস্থা সব সময় ছিল। তার আগের ফারুক ভাই কিংবা পরের নান্নু (মিনহাজুল আবেদীন) সবাই ভরসা করতেন। দলের কঠিন সময়ে নান্নু আমার হাতে বল তুলে দিয়ে বলত, ‘কাকা, আপনি কিছু একটা করেন।’

প্রশ্ন : আপনাদের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দলটিও তো ছিল দারুণ…

ওয়াহিদুল গনি : জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে দুইবার আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। দুইবারই আমার পারফরম্যান্স খুব ভালো।

প্রশ্ন : আপনার পর বাংলাদেশ সেভাবে কোনো লেগ স্পিনার পায়নি। এর কারণ কী?

ওয়াহিদুল গনি : আমার কাছে কারণটা খুব স্পষ্ট— আমার সময়ে বাংলাদেশের কেউ যেমন লেগ স্পিনটা বোঝেনি, তেমনি এখনো কেউ বোঝে না। লিখনকে (জুবায়ের হোসেন) দিয়ে চেষ্টা হয়েছে। তবে ছেলেটিকে সময়ের আগে জাতীয় দলে খেলিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি এখনো মনে করি, ও অনেক দিন জাতীয় দলে খেলার সামর্থ্য রাখে। এই যে কিছু দিন আগে রবির স্পিন হান্ট কার্যক্রমে আমি প্রধান কোচ ছিলাম। সেখানে বাছাই করা ১০ জনের মধ্যে সাতটি ছেলেই তো লেগ স্পিনার। ওদের ঘষেমেজে তৈরি করতে পারলে ভবিষ্যতে অনেক লেগ স্পিনার দেখবেন।

প্রশ্ন : বিসিবির গেম ডেভেলপমেন্টে কোচ হিসেবে আছেন এখন। তা কত দিন ধরে?

ওয়াহিদুল গনি : ২০০১ সালে ঢুকি, মাঝে কিছু সময় বিরতি দিয়ে ২০০৫ থেকে আছি একটানা। আমি বিষেণ সিং বেদীর সঙ্গেও কিন্তু একসঙ্গে কোচিং করিয়েছি। আর একটা কথা অনেকে জানেন না, আমি জাতীয় দলের নির্বাচকও ছিলাম। ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি জয়ী দল নির্বাচন করি আমরা। নির্বাচক কমিটিতে চেয়ারম্যান মাখন ভাই, সঙ্গে আমি, দীপু চৌধুরী ও হীরা ভাই। পরে সাবের ভাই বললেন, কোচিং করানো ও নির্বাচক হওয়ার মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে। আমি আর দীপু চৌধুরী পুরোপুরি চলে আসি কোচিংয়ে।

প্রশ্ন : ক্লাব কোচিং বোধ হয় সেভাবে করাননি?

ওয়াহিদুল গনি : কারণ আমাকে ডাকা হয় না। ২০০০ সালে মোহামেডানে একবার করিয়েছি আর গত বছর কলাবাগান একাডেমিতে। অবশ্য বাংলাদেশের যে ক্লাব-সংস্কৃতি, তাতে ওখানে কোচিং করিয়ে আমি টিকতে পারতাম না।

প্রশ্ন : বিয়ে করেননি। কেন?

ওয়াহিদুল গনি : করা হয়ে ওঠেনি। পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে অন্যদের দেখতে হয়েছে। আর বিয়ে করলে এই ছেলেদের সময় দিত কে? তখন কোচ ওয়াহিদুল গনি হয়ে উঠতে পারতাম না। এখানকার সংগঠক মুশতাক ভাই, মাস্টার আজিজ কিংবা ফুটবলের আরো অনেকে ছিলেন, যাঁরা এভাবেই পরিবার ফেলে খেলাকেই শুধু সময় দিয়েছেন। আমিও তাই।

প্রশ্ন : শেষ প্রশ্ন। জীবন নিয়ে, খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে ক্যারিয়ার নিয়ে আপনার তৃপ্তি কতটা? কোনো অতৃপ্তির জায়গা আছে কি না?

ওয়াহিদুল গনি : সব সময় আমি খুব সাদাসিধে জীবনযাপন করেছি। এখনো ভাড়া বাসায় থাকি, এখনো বাসে যাতায়াত করি। দুবেলা খেতে পারছি যে, তাতেই খুশি। ছোটবেলায় লাহোরে আমাদের এলাকার একজন ক্রিকেট কোচ ছিলেন, ওনাকে ডাকতাম ‘রশিদ ভাই’। দেখতাম, ওনার জীবনের কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। সারা দিন ছোট ছোট ছেলেদের সঙ্গে লেগে থেকে তাদের ক্রিকেট শেখাচ্ছেন। এখন চিন্তা করে বুঝি, ওই রশিদ ভাইয়ের চরিত্র হয়তো আমার মনের ভেতরে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে। আরেকজনের প্রবল প্রভাব আছে—বিখ্যাত সংগীতশিল্পী মোহাম্মদ রফি। তিনিও খুব সাদাসিধে জীবন কাটাতেন। কারো সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলতেন না। এত মহান গায়ক, কিন্তু কেউ কখনো তাঁকে আগে সালাম দিতে পারেননি; উনিই আগে দিতেন। দুটি রুটি হলেই তাঁর খাওয়া হয়ে যেত। মোহাম্মদ রফির গান ছাড়া আমার এখনো চলে না; তাঁর জীবনী আমি পড়েছি। ওনার জীবন আমাকে খুব অনুপ্রাণিত করে। সে জন্য জীবন থেকে চাওয়া-পাওয়ার বেশি কিছু নেই। আমার সবচেয়ে বড় আনন্দের জায়গা, সবাই আমাকে খুব সম্মান করে। তবে জীবনের এ পর্যায়ে এসে আমি অর্থনৈতিকভাবে কখনো কখনো একটু অনিশ্চয়তায় থাকি। কারণ ক্রিকেট বোর্ডের চাকরি ছাড়া আমার আর কোনো উপার্জন নেই।

আর ক্রিকেট ক্যারিয়ার নিয়ে আক্ষেপ বলতে জাতীয় দলে আরো অনেক বেশি সুযোগ পাওয়া উচিত ছিল। কোচিং ক্যারিয়ার নিয়ে কোনো অতৃপ্তি নেই। কত কত ক্রিকেটারের শুরুটা আমার হাত দিয়ে—এটি আসলেই বড় পাওয়া। অনেক বড় আনন্দের জায়গা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.