বিশ্বজগত : উপাদান ও সৃষ্টিরহস্য

স্থান ও সময় এবং এর মধ্যকার সবকিছু নিয়েই বিশ্বজগত বা মহাবিশ্ব । পৃথিবী এবং অন্যান্য সমস্ত গ্রহ, সূর্য ও অন্যান্য তারা ও নক্ষত্র, জ্যোতির্বলয়স্থ স্থান ও এদের অন্তর্বর্তী সুপ্ত পদার্থ , ল্যামডা-সিডিএম নকশা, তমোশক্তি ও  মহাকাশ—যেগুলো এখনও তাত্ত্বিকভাবে অভিজ্ঞাত কিন্তু সরাসরি পর্যবেক্ষিত নয়— এমন সব পদার্থ ও শক্তি মিলে যে- জগত তাকেই বলা হয় মহাবিশ্ব বা বিশ্বজগত। বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণে মহাবিশ্বের ব্যাস প্রায় ৯১ বিলিয়ন আলোকবর্ষ । পুরো বিশ্বের আকার অজানা হলেও এর উপাদান ও সৃষ্টিধারা নিয়ে বেশ কয়েকটি হাইপথেসিস বিদ্যমান রয়েছে।  বিগব্যাং তত্ত্ব অনুসারে বিশ্বের আয়তন ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সম্প্রতি আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানীদের বিভিন্ন তত্ত্বে আমাদের এই দৃশ্যমান মহাবিশ্বের পাশাপাশি আরো অনেক মহাবিশ্ব থাকার অর্থাৎ অনন্ত বিশ্ব থাকার সম্ভাবনার কথাও বলা হচ্ছে। [Webster’s New World College Dictionary, Wiley Publishing, Inc, ২০১০।]

কী আছে এই বিশ্বজগতে : প্রাচীনকালে মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করার জন্য নানাবিধ বিশ্বতত্ত্বের আশ্রয় নেওয়া হতো। পুরাতন গ্রিক দার্শনিকরাই প্রথম এই ধরনের তত্ত্বে গাণিতিক মডেলের সাহায্য নেন এবং পৃথিবী কেন্দ্রিক একটি মহাবিশ্বের ধারণা প্রণয়ন করেন। তাঁদের মডেলে পৃথিবীই মহাবিশ্বের কেন্দ্রে অবস্থিত এবং পৃথিবীকে কেন্দ্র করে সমস্ত গ্রহ, সূর্য ও নক্ষত্ররা ঘুরছে। গ্রিকদের এই মডেলে মহাবিশ্বের মোট আয়তন বর্তমানে জ্ঞাত বৃহস্পতি গ্রহের কক্ষপথের মধ্যেই ছিলো। তারা ভেবেছিলেন আকাশের তারারা আমাদের থেকে খুব বেশি দূরে নয়। বেশ কয়েকজন জ্যোতির্বিদ পৃথিবীকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করলেও চৌদ্দশো শতকে কোপের্নিকাস সৌরকেন্দ্রিক মহাবিশ্বকে যৌক্তিকভাবে তার বইয়ে উপস্থাপনা না করা পর্যন্ত মানুষ মনে করতো বিশ্বজগত মানে কেবল আমাদের এই পৃথিবী । পরবর্তীকালে নিউটনের গতি ও মহাকর্ষ সংক্রান্ত গভীর ধারণা পর্যবেক্ষণের সাথে সৌরকেন্দ্রিক জগতের সামঞ্জস্য নির্ধারণ করে। ধীরে ধীরে জ্যোতির্বিদরা আবিষ্কার করেন সূর্যের মতই কোটি কোটি তারা দিয়ে একটি গ্যালাক্সি গঠিত। কয়েক শত বছর বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিলো সমগ্র মহাবিশ্ব মানে শুধুমাত্র আমাদের এই ছায়াপথ গ্যালাক্সিটিই। গত শতাব্দির ২০-এর দশকে উন্নত দুরবীনের কল্যাণে জ্যোতির্বিদরা আবিষ্কার করলেন ছায়াপথের বাইরে অন্য গ্যালাক্সিদের। [Curtis, H. D. ১৯৮৮। “Novae in Spiral Nebulae and the Island Universe Theory, 100: 6]

সেই কোটি কোটি গ্যালাক্সিদের মধ্যে ছায়াপথের মতই কোটি কোটি তারাদের অবস্থান। সেই সমস্ত গ্যালাক্সিদের থেকে আগত আলোর বর্ণালি বিশ্লেষণে বোঝা গেলো সেই গ্যালাক্সিগুলি আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। [Hubble, E. P.; Humason, M. L. ১৯৩১,Astrophysical Journal 74: 43]

এর সহজতম ব্যাখ্যা হল গ্যালাক্সিদের মধ্যে স্থানের প্রসারণ হচ্ছে এবং প্রতিটি গ্যালাক্সিই অন্য গ্যালাক্সি থেকে দূরে সরছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা হল সুদূর অতীতে সমস্ত গ্যালাক্সিগুলি বা তাদের অন্তর্নিহিত সমস্ত পদার্থই একসাথে খুব ঘন অবস্থায় ছিল এবং কোন মহা বিস্ফোরণের ফলে বস্তুসমূহ একে অপর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এই বিস্ফোরণের নাম দেওয়া হলো বিগ ব্যাং। বিংশ শতাব্দীর শেষে এসে জ্যোতির্বিদরা আবিষ্কার করলেন মহাবিশ্বের প্রসারণ ত্বরাণ্বিত হচ্ছে। এই আবিষ্কারটি বিশ্বতত্ত্বের অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিয়েছে। [Adam G. Riess et al. 1998, The Astronomical Journal, 116, #3]

মহাবিশ্বের স্রষ্টা কে : বিজ্ঞান যা-ই বলুক, এই মহাবিশ্ব আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি । এটা বহুভাবে প্রমাণিতও বটে । চাঁদে বিচরণকারী ষষ্ঠ নভোচারী এডগার মিশেল বলেছেন— আমাদের গ্রহের অবলোকনে ছিলো ঐশী আভাস। আরেকজন মহাকাশচারী জেমস আরউইন পরিষ্কারভাবেই বলেছেন—  এটা আল্লাহর সৃষ্টি । আমেরিকান সাংবাদিক ডেবোরা পটার বিশ্বজগত নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন—  এটা দেখা মাত্র অবশ্যই মানুষের মাঝে পরিবর্তন আসবে, সে আল্লাহর সৃষ্টিকে আল্লাহর ভালবাসাকে মূল্যায়ন করবে । [আত-তরিক ইলাস সায়াদাহ, মাওলানা হাকিম তাদরিক কিলানি, পৃষ্ঠা ৩০]

আল্লাহ তায়ালা নিজেও তার সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা করতেও বলেছেন । কেননা, আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়নের সবচেয়ে উপযোগী পন্থা। এতে মানুষের মনে বিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। তিনি বলেছেন— আল্লাহ যথার্থরূপে নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করেছেন। এতে নিদর্শন রয়েছে ঈমানদার সম্প্রদায়ের জন্যে।[সূরা আনকাবুত, আয়াত ৪৪]

মানুষ যদি এ মহাবিশ্ব ও এর ভিতরে যা কিছু আছে তা নিয়ে একটু চিন্তা করে এবং গভীরভাবে গবেষণা করে তবে সে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করবে যে, এ বিশ্ব অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে সুবিন্যস্ত করে সৃষ্টি করা হয়েছে। একজন প্রজ্ঞাময়, সর্বশক্তিমান ও সর্বজ্ঞানী ইলাহের মাধ্যমেই যা সম্ভব । তিনি বলেন— কাফেররা কি ভেবে দেখে না যে, আকাশমণ্ডলি ও পৃথিবীর মুখ বন্ধ ছিলো, অতঃপর আমি উভয়কে খুলে দিলাম এবং প্রাণবন্ত সবকিছু আমি পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। এরপরও কি তারা বিশ্বাস স্থাপন করবে না? আমি পৃথিবীতে ভারী বোঝা রেখে দিয়েছি যাতে তাদেরকে নিয়ে পৃথিবী ঝুঁকে না পড়ে এবং তাতে প্রশস্ত পথ রেখেছি, যাতে তারা পথ প্রাপ্ত হয়। আমি আকাশকে সুরক্ষিত ছাদ করেছি; অথচ তারা আমার আকাশস্থ নিদর্শনাবলি থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে। তিনিই সৃষ্টি করেছেন রাত্রি ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্র। সবাই আপন আপন কক্ষপথে বিচরণ করে। [সূরা আম্বিয়া, আয়াত ৩০-৩৩]

বিশ্বজগত সৃষ্টির সময় ও পদ্ধতি : পৃথিবী ও আকাশ মন্ডলীর সৃষ্টি রহস্য উম্মুক্ত করে দিয়ে আল্লাহ বলেন— আর তিনি আকাশমণ্ডলি ও জমিনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, অথচ এর আগে তাঁর আরশ ছিল পানির উপর । [সূরা হূদ]

এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা পানি বলতে দ্রবীভূত রূপকে ইঙ্গিত করেছেন। এ ভাবে কোরআনের আরও বহু আয়াতে ছয়দিনের কথা উল্লেখ করেছেন । এখানে ‘দিন’ শব্দ যুগ বা কালের অধ্যায় অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন, আল্লাহ বলেছেন— এবং প্রকৃতপক্ষে তোমার আল্লাহর কাছে এক দিন হাজার বছরের সমান, যেমন করে তোমরা হিসাব করো। [সূরা হজ্জ, আয়াত ৪৭]

বিশুদ্ধ বর্ণনা অনুসারে যে ছয় দিনে জগৎ সৃষ্টি করা হয়েছে, তা রবিবার থেকে শুরু হয়ে শুক্রবার। শনিবারে জগৎ সৃষ্টির কাজ করা হয়নি। এ ছয় দিনের কার্যাবলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা সুরা হা-মিম সিজদার নবম ও দশম আয়াতে রয়েছে। রবি ও সোমবার- এ দুই দিনে পৃথিবী সৃষ্টি করা হয়েছে। মঙ্গল ও বুধবার ভূমণ্ডলের সাজসরঞ্জাম- পাহাড়, নদী, খনি, বৃক্ষ, সৃষ্টজীবের পানাহারের বস্তু সৃষ্টি করা হয়েছে। বৃহস্পতি ও শুক্রবার সাত আকাশ সৃষ্টি করা হয়েছে। [তাফসিরে মাআরেফুল কোরআন ও ইবনে কাসির]

আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে এটা সুস্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছে যে, সৃষ্টি ছয় দিন বলতে ছয়টা পর্যায়কে বুঝানো হয়েছে।

আর পদ্ধতি হিসেবে তিনি কোরআনে ঘোষণা দিয়েছেন—  তিনি নভোমন্ডল ও পৃথিবীর স্রষ্টা। তিনি যা কিছুরই ইচ্ছা পোষণ করেন, তার জন্য শুধু বলেন, ‘হও’ আর সাথে সাথে তা হয়ে যায়। [সূরা বাকারার আয়াত ১১৭]

ছয় দিনে সৃষ্টির কারণ : এখানে প্রশ্ন হতে পারে যে আল্লাহ তাআলা গোটা বিশ্বকে মুহূর্তের মধ্যে সৃষ্টি করতে সক্ষম। স্বয়ং কোরআনেও বিভিন্ন ভঙ্গিতে এ কথা বারবার বলা হয়েছে। এ অবস্থায় বিশ্ব সৃষ্টিতে ছয় দিন লাগার কারণ কী? প্রখ্যাত তাফসিরবিদ সাইদ ইবনে জুবায়ের (রা.) এ প্রশ্নের উত্তরে বলেন—  আল্লাহ তাআলার মহাশক্তি নিঃসন্দেহে একনিমিষে সব কিছু সৃষ্টি করতে পারে; কিন্তু মানুষকে বিশ্বব্যবস্থা পরিচালনায় ধারাবাহিকতা ও কর্মপক্বতা শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এতে ছয় দিন ব্যয় করা হয়েছে। এক হাদিসে এসেছে—  চিন্তাভাবনা, ধীরস্থিরতা ও ধারাবাহিকতা সহকারে কাজ করা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হয়; আর তড়িঘড়ি কাজ করা শয়তানের পক্ষ থেকে। [তাফসিরে মাজহারি]

কেনো তিনি বিশ্বজগত সৃষ্টি করেছেন : জ্ঞানী লোক যখন আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করে তখন সে নিশ্চিতভাবে জানতে পারে এ-বিশ্বে যা কিছু আছে সব কিছুই আল্লাহর ইবাদত করে। সব সৃষ্টজীব আল্লাহর পবিত্রতা বর্ননা করে ও গুণকীর্তন করেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন—  রাজ্যাধিপতি, পবিত্র, পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময় আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করে, যা কিছু আছে নভোমণ্ডলে ও যা কিছু আছে ভূমণ্ডলে। [সূরা জুমআ, আয়াত ১]

তারা সকলে আল্লাহর মহিমার সামনে সিজদাবনত হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন— তুমি কি দেখনি যে, আল্লাহকে সেজদা করে যা কিছু আছে নভোমণ্ডলে, যা কিছু আছে ভুমন্ডলে, সূর্য, চন্দ্র, তারকারাজি পর্বতরাজি বৃক্ষলতা, জীবজন্তু এবং অনেক মানুষ। আবার অনেকের উপর অবধারিত হয়েছে শাস্তি। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা লাঞ্ছিত করেন, তাকে কেউ সম্মান দিতে পারে না। আল্লাহ যা ইচ্ছা তা-ই করেন। [সূরা হজ্জ, আয়াত ১৮]

অন্য আয়াতে বলেছেন— তুমি কি দেখ না যে, নভোমণ্ডল ও ভূমনণ্ডলে যারা আছে, তারা এবং উড়ন্ত পক্ষীকুল তাদের পাখা বিস্তার করতঃ আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে? প্রত্যেকেই তার যোগ্য এবাদত এবং পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণার পদ্ধতি জানে। তারা যা করে, আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক জ্ঞাত। [সূরা নুর, আয়াত ৪১]

বিশ্বজগতের স্রষ্টা আল্লাহ তায়ালা নিজেই পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, যে তিনি তার নিজের মহিমা প্রকাশ এবং তার প্রতি সৃষ্টির ইবাদতের উদ্দেশ্যেই এই বিশ্বজগত সৃষ্টি করেছেন । [পবিত্র কোরআনের আলো, দৈনিক কালের কণ্ঠ, ১৬ জুন ২০১৫] 

Leave a Reply

Your email address will not be published.