কিম শাসনে কতটা ভালো আছে উত্তর কোরিয়ার জনগণ?

নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অবশেষে ১২ জুন সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনের ঐতিহাসিক বৈঠক। ধারণা করা হচ্ছে আলোচনার টেবিলে মূল বিষয় হয়ে উঠবে কোরীয় উপদ্বীপকে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ করার বিষয়টি। কিন্তু জাতিসংঘ বলছে, উত্তর কোরিয়ার লোকজন প্রতিনিয়ত, ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছে; অথচ তাদের মানবাধিকারের বিষয়টি আলোচনার টেবিলে নিশ্চিতভাবেই ঠাঁই পাবে না। উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ অবস্থা এখন কেমন—তা নিয়ে আজ রোববার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি। সেখানকার উল্লেখযোগ্য কিছু অংশ তুলে ধরা হলো।

সবকিছু সরকারের নিয়ন্ত্রণে

পুরো বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন উত্তর কোরিয়াকে তিন প্রজন্ম ধরে কিম পরিবার শাসন করে আসছে। এখানকার জনগণকে বর্তমান শাসক কিম জং-উনসহ এই পরিবারের প্রতি পুরোপুরি অনুগত থাকতে হয়। এখানকার সরকার নাগরিকদের ওপর ব্যাপক গোয়েন্দা নজরদারি করে। শুধু যে জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করে তা-ই নয়, কঠোরভাবে অর্থনীতিকেও নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন দেশটিতে খাদ্য, জ্বালানিসহ মৌলিক পণ্যের ব্যাপক ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও সরকার পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ ঢালে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়াবিষয়ক পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বিবিসিকে বলেন, ‘উত্তর কোরিয়া কেবল ব্যয়বহুল পরমাণু কর্মসূচির উন্নয়নই করতে পারে, কারণ এটি একটি সর্বগ্রাসী রাষ্ট্র। এটি করতে গিয়ে দেশটির সরকার উত্তর কোরিয়ার ক্ষুধার্ত জনগণের খাবার কেড়ে নেয়।’

গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ

বলা হয় বিশ্বে সবচেয়ে শক্তভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় উত্তর কোরিয়ার গণমাধ্যমকে। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ)-এর ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে দেশটির অবস্থান সবচেয়ে নিচের দিকে।
উত্তর কোরিয়ার জনগণ মূলত রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের কাছ থেকে সব ধরনের খবর, বিনোদন ও তথ্য পেয়ে থাকে। সেসব খবরে থাকে সরকারের অবিরাম প্রশংসা। আরএসএফের তথ্য অনুযায়ী, কেউ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কোনো খবর দেখলে, শুনলে বা পড়লে, তাকে কারাগারেও পাঠানোর ঘটনা ঘটে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এক গবেষক আর্নল্ড ফ্যাং বিবিসিকে বলেন, ‘এখানে মোবাইলে কথা বলা যায়। তবে দেশের বাইরে ফোন করা খুব সহজ নয়।’
এ ছাড়া এখানে ইন্টারনেটও সবার জন্য সহজলভ্য নয়। রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে কতিপয় অভিজাত ব্যক্তি শুধু তা ব্যবহার করতে পারেন। তবে সেখানেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। দেশটির নিজস্ব ইন্টারনেট রয়েছে। তবে বেশির ভাগ মানু্ষই অনলাইনে ঢোকে না।

ধর্মীয় স্বাধীনতা
দেশটির সংবিধান অনুযায়ী ‘নিজস্ব বিশ্বাস বজায়’ রাখার অধিকার আছে। দেশটিতে বৌদ্ধ, সামানিস্ট ও চন্দোইজমে বিশ্বাসী লোকজন রয়েছে, এমনকি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রিত গির্জাও আছে। কিন্তু ফ্যাং বলেছেন, এগুলো সবই লোক দেখানো। সত্যি হলো, এখানে কোনো ধর্মীয় স্বাধীনতা নেই। এখানে প্রত্যেককে কিম পরিবারের বন্দনা করতে শেখানো হয়।
২০১৪ সালে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গির্জার বাইরে অন্য গির্জায় খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীরা উপাসনা করায় তাদের ‘নিপীড়ন ও গুরুতর শাস্তি’ দেওয়া হয়।

কারা ক্যাম্প ও বন্দিদশা

বলা হয়, উত্তর কোরিয়া হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে উন্মুক্ত কারাগার। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটিতে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ কারাগারে আছে। যেকোনো কিছুর জন্য এখানে কারাদণ্ড হতে পারে। যেমন কেউ দক্ষিণ কোরিয়ার ডিভিডি দেখলে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

আর রাজনৈতিক অপরাধের দায়ে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। খনিতে বা গাছ কাটার কাজ করতে হয় বন্দীকে।
অ্যামনেস্টি জানায়, কারারক্ষীরা বন্দীদের নানাভাবে নির্যাতন করে। নারীদের ওপর যৌন নিপীড়নসহ জোরজবরদস্তি চালানো হয়। এখানে একজন অপরাধ করলে পুরো পরিবারকে অপরাধী হিসেবে শাস্তি দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় অহরহ। এমনকি প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদও দেওয়া হয়।

বিদেশি বন্দী

দেশটিতে রাজনৈতিক কারণে বিদেশিদের গ্রেপ্তার করে লম্বা সময় বন্দী করে রাখা হয়। পরে সুযোগ বুঝে তাদের ব্যবহার করা হয়। যেমন রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তিন মার্কিন নাগরিককে কারাগারে লেবার ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হতে যাওয়া ঐতিহাসিক বৈঠকের অংশ হিসেবে সম্প্রতি তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

এখনো দেশটিতে দক্ষিণ কোরিয়ার ছয় নাগরিক আটক আছেন। অন্যদিকে ১৯৭০-এর দশকে উত্তর কোরিয়া থেকে ১৩ জাপানিকে অপহরণ করা হয়েছিল। তাদের জাপানি ভাষায় গুপ্তচরদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে বলা হয়। এমনকি সে সময় উত্তর কোরিয়ার চলচ্চিত্র তৈরির জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার বিখ্যাত এক অভিনেত্রী ও তাঁর সাবেক স্বামীকে অপহরণ করা হয়েছিল। তবে তাঁরা পালাতে সক্ষম হয়েছিলেন।

জোরপূর্বক শ্রম
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক বিশাল সংখ্যক লোককে জীবনের কোনো একটা সময়ে বিনা মূল্যে কাজ করতে হয়। উত্তর কোরিয়া থেকে বেরিয়ে এসেছে—এমন এক সাবেক শিক্ষার্থী এইচআরডব্লিউকে বলেছে, বছরে তাদের দুই বার স্কুল থেকে জোর করে বিনা মূল্যে খেতে-খামারে কাজ করতে পাঠানো হতো। চাষবাস ও ফসল কাটার এক মাস করে তাদের কাজ করতে হতো।

দেশটি খুবই কম পারিশ্রমিকের বিনিময়ে হাজারো মানুষকে চীন, কুয়েত, কাতারে কাজ করতে পাঠায়। তাদের অনেককেই সেখানে ক্রীতদাসের মতো জীবনযাপন করতে হয়। তারা সেখান থেকে নামমাত্র যে বেতন পায়, তার সিংহভাগই রাষ্ট্র কেড়ে নেয়। তবে এসব দেশ জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার কারণে এখন উত্তর কোরিয়ার নাগরিকদের ওয়ার্ক ভিসা নবায়ন করছে না।

নারী অধিকার

নারীদের প্রতি বৈষম্য এখানে চরম। তবে ছেলেমেয়ের মধ্যে এই বৈষম্য পরিমাপের কোনো মাপকাঠি নেই। উত্তর কোরিয়া নিজেকে সমতাভিত্তিক সমাজ হিসেবে দাবি করলেও এখানে নারীরা শিক্ষা ও কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়াবিষয়ক পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, এখানে যৌন হয়রানিসহ নানা কারণে নারীদের অবস্থা খুবই নাজুক। কেউ কোনো নারীকে নাজেহাল করলে অভিযোগ শোনার কেউ নেই।
বন্দী অবস্থায় থাকার সময় নির্যাতন, ধর্ষণসহ নানা যৌন হয়রানির শিকার হয় নারীরা। আর সেনাবাহিনীতে তা ব্যাপক হারে হয়ে থাকে।

অপুষ্টির শিকার শিশুরা

দেশটির শিশুরা স্কুলে গেলেও অনেককে অল্প দিনের মধ্যেই ঝরে পড়তে হয়। কারণ পরিবারকে সাহায্য করতে তাদের স্কুল ছাড়তে হয়। স্কুলের পাঠ্যক্রম দেশটির রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। খুব অল্প বয়স থেকে শিশুদের জানার পরিধিকে সীমিত করে দেওয়া হয়।
ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, ২ লাখ শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। আর এর মধ্যে ৬০ হাজার ‘গুরুতরভাবে অপুষ্টিতে’ ভুগছে।

তবে উত্তর কোরিয়া বরাবরই অধিকারবিষয়ক তাদের সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে আসছে। তারা বলে, তাদের জনগণ ‘বিশ্বের সবচেয়ে কার্যকর মানবাধিকার’ পেয়ে গর্বিত। কিন্তু মানবাধিকারকর্মী অ্যাডামস বলেন, উত্তর কোরিয়ার মানবাধিকার হলো ‘তলাবিহীন গভীর কূপ’।

অ্যাডামস বলেন, ‘প্রত্যেকে তার নিজের স্বার্থ নিয়ে কথা বলার অপেক্ষায় আছে। কেউ উত্তর কোরিয়ার জনগণের স্বার্থ নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী নয়।’

Leave a Reply

Your email address will not be published.